সন্তান সম্ভবা মহিলাকে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেওয়া মানতে পারেননি ব্যারেটো



আগের লেখাতেই বলেছি, এক দুপুরে কেষ্টপুরের বাড়ি নিয়ে গিয়ে ব্যারেটোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন অরুণ সেনগুপ্ত। তারপর থেকে আমার অবসর সময় কাটানোর ঠিকানাটাই হয়ে গিয়েছিল ব্যারেটোর বাড়ি। কিছুদিনের মধ্যে সেখান থেকে কসবায় নীলাচল কমপ্লেক্সে চলে এলেন। ফলে আড্ডা দিতে আমার সুবিধাটা আরও বেশি হয়ে গেল।
কলকাতায় থাকলে সেই সময় ব্যারেটোর রুটিন ছিল, সকালে মোহনবাগান মাঠে প্র‌্যাকটিস। তারপর নীলাচল কমপ্লেক্সে ফিরে লাঞ্চ। একটু বিশ্রাম। বিকেল তিনটের দিকে ফ্ল্যাটে চলে আসতেন শুভ্রা ম্যাম। ব্যারেটোর ইংরাজি টিচার। হাডকোর কাছে থাকেন। সেখান থেকে প্রতিদিন বিকেলে চলে আসতেন ব্যারেটোকে ইংরাজি শেখাতে। অনেকদিন এমন হয়েছে, ব্যারেটো পড়াশোনা করছে, আমি ওর ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছি। পড়াশোনা শেষ হলে ওর গাড়িতে শুভ্রা ম্যামকে পৌঁছে দিয়ে এসেছি। শুভ্রা ম্যামের সঙ্গে অবশ্য এখনও আমার যোগাযোগ রয়েছে নিয়মিত।
বলরাম চৌধুরি যখন ক্ষমতায়, সেই সময় কেন মোহনবাগান ছেড়েছিলেন ব্যারেটো? সেই সময় যে যেভাবে খুশি নিজের মত করে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কখনই মুখ খোলেননি ব্রাজিলিয়ান তারকা। ফুটবলের অজানা গল্প লিখতে বসে মনে হল, এবার ঘটনার পিছনের ঘটনাটা কিছুটা হলেও এবার বলে ফেলা উচিৎ।
টুটু বোস, অঞ্জন মিত্রদের জায়গায় আদালতের নির্দেশে মোহনবাগান ক্লাব তখন চালাচ্ছেন বলরাম চৌধুরি, কেষ্ট সাহা, রাজু আগরওয়ালরা।  বলাই বাহুল্য ক্লাব চালাতে যে খরচ, তা একাই বহন করছিলেন বলরামবাবু। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগন্য। অন্যরা হাওয়া গরম করলেও পকেট থেকে অর্থ বের করার সময় নেই। ফলে ক্লাব জুড়ে একটা অস্থির পরিবেশ। কিছুতেই সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে যাচ্ছিল না। কোচ তখন অলোক মুখার্জি। জাতীয় লিগে দল খেলতে গেল গোয়ায়।
মারগাঁওয়ে উডল্যান্ডস হোটেলের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা গিয়েছে সেই রাস্তা ধরে চলে গিয়ে রেল লাইনের ধারে একটি হোটেলে ছিলেন ব্যারেটোরা। বোধ হয় টানা দুটো ম্যাচ ছিল। আর দুটো ম্যাচেই অতি জঘন্য খেলল দল। মাঠের বাইরে পরিস্থিতি ভাল না থাকলে তার প্রভাব দলের পারফরম্যান্সেও পড়বে। ব্যারেটোর সঙ্গে তখন স্ট্রাইকার ছিলেন অসীম বিশ্বাস। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, ম্যাচটা কার বিরুদ্ধ হেরে ছিলেন ব্যারেটোরা।
 ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম ছাড়ার সময় যখন বাসে উঠতে যাবেন, বললেন, কাজ শেষে করে ওর রুমে যেতে।
  ডাইনিং রুমে গেলেন না সবার সঙ্গে খেতে। রুমেই ডিনার অর্ডার করলেন। ব্যারেটো বসে নিজের খাটের উপর। আর আমি হোটেল রুমের ফ্লোরে কার্পেটের উপর হাত পা ছড়িয়ে।
কী ভীষণ অসহায় লাগছিল। এরকম ভাবে ভেঙে পড়তে কোনওদিন দেখিনি। এমনিতেই ধাক্কা মারতে মারতে কথা বের করতে হয়। এদিন তো আরও চুপ। অনেকক্ষন চুপ করে থাকার পর নীরবতা ভেঙে শুধু বললেন, “অসীম এরকম করবে কোনওদিন ভাবতে পারিনি।”
অসীম ! একজন জুনিয়র ফুটবলার ব্যারেটোকে কী করতে পারেন! সাত–পাঁচ ভেবে যখন কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না, তখন নীরবতা ভেঙে বললেন, “কোনও রেসপেক্ট নেই। মাঠের মধ্যে বল চাইলে অঙ্গভঙ্গি করে চিৎকার করছে। তুমি ভাবছ, এটা অসীম করছে, আসলে আমাকে ডিসটার্ব করার জন্য ওকে দিয়ে করাচ্ছে।”
তাহলে কোচ অলোক মুখার্জিকে বলছ না কেন?
–“বলে লাভ নেই। কিছু করতে পারবে না। দলের মধ্যে কেউ কারও কথা শোনে না।  ভারতে খেলতে এসে এরকম পরিস্থিতির মধ্যে সত্যি কোনওদিন পড়িনি।”
কথা শেষে সতর্কবানী–“এগুলো কিন্তু লেখার জন্য বলিনি। আর ভাল লাগছে না। তাই শেয়ার করলাম।”  তাহলে ডাকলে কেন?
–“দলটার মধ্যে ভীষণ একা লাগছে। তাই শেয়ার করার জন্য ডাকলাম।”
এটা ঠিক যে, সেই রাতে ব্যারেটো একবারও বলেননি, কলকাতায় গিয়েই মাঝ মরশুমে মোহনবাগান ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা করবেন। এই কথাটা যদি সেই রাতে বলতেন, তাহলে স্টোরি করব না, এরকম কথা কখনও দিতে পারতাম না। আমার খালি মনে হচ্ছিল, চারিদিকের অব্যবস্তায় মারাত্মক ভাবে হতাশ হয়ে পড়ছেন। মানে মানে মরশুমটা শেষ করে দিতে পারলে বেঁচে যান।
পরের দিন সকালের বিমানেই কলকাতা ফিরে গেল। মুম্বই হয়ে ট্রেনে ফেরার জন্য শহরে ফিরতে আমার লেগে গেল আরও তিনদিন। আর ট্রেনে বসেই খবর পেলাম, শহরে বসে ব্যারেটো ঘোষণা করে দিয়েছেন, মরশুমের মাঝপথেই মোহনবাগান ছেড়ে দিচ্ছেন।
শহরে পা দিয়ে বুঝলাম, ব্যারেটোর এই ঘোষণায় তুমুল আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। তিনি মোহনবাগান ছাড়ছেন, এটা ঠিক। কিন্তু কেন ছাড়ছেন, খোলসা করে কিছুই বলছেন না। এদিকে, বলরাম চৌধুরিরা বলছেন, চুক্তি থাকা অবস্থায় কোনও ফুটবলার দল ছেড়ে দিলে তাঁর বিরুদ্ধে ফিফায় যাবে ক্লাব। তাহলে তো ব্যারেটোর শাস্তি অনিবার্য। কিন্তু তিনি অদ্ভুত ভাবে শান্ত। একবার যখন ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, ব্যস, সেই সিদ্ধান্ত থেকে আর নড়ছেন না।
সেই সময়টায় কারও ফোন ধরছেন না। দেখাও করছেন না। কিন্তু ব্যারেটোকে ঘিরে মোহনবাগান জনতার কী পরিমাণ উৎসাহ ছিল সেই সময়টায় দেখেছি। মিডিয়া থেকে ভক্তকুল, প্রতিদিন নীলাচল কমপ্লেক্সের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত।
এক দুপুর নীলাচল কমপ্লেক্সে গিয়েছি। কড়া চোখে রক্ষীর প্রশ্ন–কোথায় যাবেন?
–ব্যারেটোর কাছে।
–কেউ অ্যালাও না।
–আমার নাম বলে একবার জিজ্ঞাসা তো করে দেখুন। তারপর না বললে যাব না।
রক্ষী ফোন ঘোরালেন ইন্টারকমে। পারমিশন এল।
ব্যারেটোর ড্রইংরুম থেকে নীলাচলের পাঁচিলের পাশে মেইন রাস্তাটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। অনেকেই জেনে গিয়েছেন, কমপ্লেক্সের ভিতর ব্যারেটোর রুম কোনটা। তাই পাঁচিলের ওপাশ থেকে উঁকি ঝুঁকি চলছে। চুপ করে বসে আছেন।
সেদিনই সবক’টি সংবাদপত্রে বড় বড় করে বেরিয়েছে, মত বদলানোর জন্য ব্যারেটোর সঙ্গে দেখা করে আলোচনা করতে চান অলোক মুখোপাধ্যায়। ব্যারেটো বললেন, “আর কারও সঙ্গে দেখা করব না। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ে ফেলেছি। তখন কোথায় ছিল, যখন প্রতিদিন সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি।” নিজের অসহায়তা বোঝানোর জন্য মরশুমের বিভিন্ন সময়ের কিছু ঘটনা খুলে বললেন তিনি। পরের দিন সংবাদ প্রতিদিনেক প্রতম পাতায় যা ব্যারেটোর কলামে প্রকাশিত হয়েছিল।
যার পরিপ্রেক্ষিতে অলোক বললেন, তিনি বিশ্বাস করছেন না, ব্যারেটো এত ক্ষোভের কথা বলতে পারেন। সেই কারণেই ব্যারেটোকে বুঝিয়ে মোহনবাগানে খেলার জন্য রাজি করাতে নীলাচল কমপ্লেক্সে গেলেন তিনি।
শুধু গেলেনই। কিন্তু দেখা করলেন না ব্যারেটো। চারিদিকে একটা হাল্কা প্রচার চলছিল, ক্লাব রাজনীতিতে ব্যারেটো দেবাশিস দত্তর কাছের লোক। দেবাশিস ক্ষমতায় নেই বলে হয়তো ক্লাব ছাড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকাকে। একদিন জিজ্ঞাসাও করলাম। সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন, “না। অন্য গল্প আছে। পরে বলব। এই সময় কোনও ঝুঁকি নিতে চাই না।” ব্যারেটোর নামে তখন নানা গল্প প্রকাশ হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। বলরাম চৌধুরি বিবৃতি দিলেন, “ব্যারেটাে যা চায়, আমরা রাজি।” সেসব শুনতেন আর বলতেন, “যা মনে আসে, বলতে দাও।”
ফুটবলের অন্য এক কর্তার মাধ্যমে বলরাম চৌধুরি একটা ফিলার পাঠালেন ব্যারেটোর কাছে। কিছু আর্থিক প্যাকেজের সঙ্গে একটাই শর্ত ছিল মোহনবাগান ছাড়া চলবে না। নাহলে ফিফায় কেস করা হবে।’’ শুনে ব্যারেটা বললেন, –“ওদের আমি আর বিশ্বাস করি না। যেখানে খুশি কেস করুক।”
সত্যি বলতে কী, পুরো ঘটনাটা না বলায়, ফিফার ব্যাপারটি নিয়ে সামান্য একটু টেনশনে আমিও ছিলাম।
কলকাতা ছাড়ার দিন ঠিক হল। ডগলাস তখন চোট পেয়ে সেই কমপ্লেক্সেই থাকতেন। যাওয়ার দিন বলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক বানী, –“প্লিজ, বাইরে প্রকাশ করার জন্য নয়। ওদের অনেক ক্ষমতা। কোনও না কোনও কেসে বিমানবন্দরে ঠিক আটকে দেবে। ”
–কিন্তু ফটোগ্রাফারকে দিয়ে একটা ছবি তুলেত পারি তো? শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ব্যারেটো। এভাবে হেডিং করব।
–ছবিটা বের হবে আমি চলে যাওয়ার পরের দিন। এই শর্তে করতে পার।”
সেই রাতেই ক্যালটাকা ক্লাবে বলরাম চৌধুরির ছেলের বৌভাতের অনুষ্ঠান। অরুণ সেনগুপ্ত আর আমি এক সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে খাচ্ছি আর আলোচনা করছি, পার্টি থেকে সোজা ব্যারেটোর ফ্ল্যাটে চলে যাব। আর একটু পরেই বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেবে ব্যারেটো। আমরা দু’জনেই দেখলাম, পার্টিতে উপস্থিত কেউই জানেন না, কবে শহর ছাড়ছে ব্রাজিলিয়ান তারকা। কারণ, সেই সময় প্রতিদিনই ব্যারেটোর শহর ছাড়া নিয়ে নিত্য নতুন দিনক্ষন ঘোষণা হত। একজন সিনিয়র সাংবাদিক দেখলাম, ডিনার প্লেটটা নিয়ে এসে অরুণদা’কে বলল, “মনে হয় না ব্যারেটো এত তাড়াতাড়ি শহর ছাড়বে।” আমি আর অরুন দা, নিজেদের মধ্যে তাকালাম আর মনে মনে হাসলাম।
পার্টি থেকে সরাসরি গেলাম ব্যারেটোর ফ্ল্যাটে। নীলাচল কমপ্লেক্সের মধ্যেই মোহনবাগানের দেওয়া ফ্ল্যাট ততদিনে বদল করে ফেলেছেন ব্যারেটো। বেশি রাতে শহর ছাড়ার আগে হাতে ক্র‌্যাচ নিয়ে দেখা করতে এলেন ডগলাস। এলেন আমাদের ফটোগ্রাফারও। রুম ছেড়ে বের হওয়ার মুখে ছবি উঠল ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক।
অন্ধকারের বুক চিরে বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে চলল গাড়ি। কোথাও কেউ নেই। বিমানবন্দরের দরজা দিয়ে ঢুকে গেলেন তারকা। কী মনে হল, ফের ফিরে এসে জড়িয়ে ধরলেন আবেগে। মনে হচ্ছিল, আর বোধহয় কোনওদিন দেখা হবে না। স্বীকার করছি,স্বজন হারানোর মত কষ্ট হচ্ছিল সেদিন। চোখে জলও চলে এল। কিন্তু এটাও সত্যি, কেন ব্যারেটো এত বড় সিদ্ধান্ত নিল, সেদিনও পুরোপুরি জানতে পারিনি। টুকরো টুকরো কথার কোলাজে কিছুটা আভাস পেতাম মাত্র। কিন্তু একমাত্র কারণটা কী?
মোহনবাগানের নির্বাচন এগিয়ে এসেছে। ব্যারেটাে তখন মালয়েশিয়ায় পেনাং এফসিতে। প্রথম বছরেই একজন বিদেশি ফুটবলার হয়েও দলের ক্যাপ্টেন। মোহনবাগান নির্বাচনের জন্য তখন একটা ব্যাপার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে, টুটু বোস ক্ষমতায় আসছেন, আর ব্যারেটো ফের ফিরছেন মোহনবাগানে। একদম দুইয়ে দুইয়ে চার।
কিন্তু একী কাণ্ড! নির্বাচনের আগের রাতে চুপিসারে মুম্বইয়ে এসে মাহীন্দ্রা ইউনাইটেডে সই করে দেশ ছাড়লেন ব্যারেটো! সব কিছু হিসেবের বাইরে ঘটে গেল। মোহনবাগান যেখানে তাঁর ফেরার রাস্তায় গোলাপ ছড়িয়ে রেখেছিল, সেখানে এলেন না কেন তিনি? বরং তাঁর আসার ঘটনায় নির্বাচনের পালে বাতাস বইতে পারত অঞ্জন মিত্রদের।
মোহনবাগানের ম্যাচ কভার করতে মুম্বই গিয়েছি। মাহীন্দ্রার বিরুদ্ধেই খেলা। রাতের বেলায় কান্দিভেলি থেকে গাড়ি চালিয়ে মোহনবাগান কর্তা, ফুটবলারদের সঙ্গে দেখা করার জন্য সবুজ–মেরুনে টিম হোটেলে এসেছেন তিনি। যাওয়ার সময় বললেন, “চলুন আমার ফ্ল্যাটে। আজ রাতটা ওখানে থাকবেন।”
জানালাম, পরের দিন সকালে মোহনবাগানের প্র‌্যাকটিস কভার করেই পৌঁছে যাব তাঁর ফ্ল্যাটে।
কান্দিভেলিতে একটা কমপ্লেক্সের ভিতর ব্যারেটোকে ফ্ল্যাট দিয়েছিল মাহীন্দ্রা। সেই সময় একাই থাকতেন। ভেরোনিকা ব্রাজিলে। ফলে মুম্বইয়ে কিছুতেই মন টিকত না তাঁর। সবে ব্যারেটোর সঙ্গে আড্ডায় বসেছি, ডোরবেলটা বেজে উঠল। ঘরের ভিতর থাকা স্ক্রিনে দেখা গেল, কলকাতা থেকে ম্যাচ কভার করতে আসা সাংবাদিকরা এসেছেন কথা বলার জন্য। ব্যারেটো ইশারা করলেন, পাশের বেডরুমে ঢুকে যেতে। তিনি রেডি হয়ে খুলে দিলেন দরজা। কলকাতা থেকে আসা সাংবাদিকরা তাঁর সঙ্গে কথা বলে চলে গেলেন। তিন রুমের ফ্ল্যাট। একটা রুমে দেখলাম, ভর্তি কার্পেট। এত কার্পেট নিয়ে করছেনটা কী? জানাল, এখান থেকে জাহাজে কার্পেট পাঠাচ্ছে  পোর্তো আলেগ্রেতে।সেখানে কার্পেটের ব্যবসা করবে ভেরোনিকা। পরের দিন সংবাদ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয়েছিল খবরটা।
ঠিক করলেন বাইরে লাঞ্চ করাতে নিয়ে যাবেন। ওর গাড়িতে গেলাম, শচীন তেন্ডুলকরের রেস্তোঁরা ‘শচীন’স’ এ লাঞ্চ করতে। সেই প্রথম শচীনস–এ যাওয়া। বুঝতে পারলাম, মুম্বইয়ে একা একা থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছেন। তার উপর এই যে কলকাতার রাস্তায় বের হলে ব্যারেটো–ব্যারেটো বলে সবার ঘিরে ধরা, এই ভালবাসা মুম্বইয়ে কোথায়? পরিবার কাছে নেই। প্র‌্যাকটিস, ম্যাচ বাদ দিয়ে সারা দিন কান্দিভেলির ফ্ল্যাটেই কেটে যায়। জোর করলেন, সেই দিনটা ওর সঙ্গে থেকে যাওয়ার জন্য। বলল, পরের দিন ওর ফ্ল্যাট থেকে লাঞ্চ করে ম্যাচ কভার করার জন্য একেবারে কুপারেজে চলে যাওয়ার জন্য। অগত্যা যেতেই হল। এরকমটা এখনও হয়। অফিসের কাজে মুম্বই গেলে এখনও নভি মুম্বই থেকে আদেশ চলে আসে, “আজ রাতটা কিন্তু আমার এখানে থাকবে।’’ আসলে অনেকদিন পর দেখা হলে দু’তরফেই প্রচুর গল্প, পিএনপিসি জমে থাকে।
তা সেদিন ডিনারের পর আমাদের আড্ডা শুরু হয়েছে। বললেন, কথা বার্তা মোটামুটি পাকা। পরের মরশুমে ফিরছেন মোহনবাগানে। কিন্তু এটা মোহনবাগান ম্যাচের আগে পরে লিখলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। তাই চান, কলকাতায় ফিরে গিয়ে দিন দশেক পরে লিখে দিতে। তিনিই প্রসঙ্গটা তোলায় সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটা রাখি, তাহলে সেদিন পেনাং থেকে মোহনবাগানে এলে না কেন? তখন এলে তো ফুলের কার্পেটের উপর দিয়ে হেঁটে ক্লাবে ঢুকতে। এতদিনকার জমে থাকা প্রশ্নটার উত্তর অবশেষে দেওয়া শুরু করল, “জানতাম দেবাশিসরা ক্ষমতায় ফিরছে। কিন্তু আমি কোনও বিতর্কে ঢুকতে চাইনি।”
–কিন্তু কেন? দেবাশিস, টুম্পাইরা থাকায় তোমার তো মোহনবাগান নিয়ে আরও কমফোর্টেবল ফিল করা উচিৎ ছিল।
–“সেটাই তো মূল সমস্যা। আমি যখন বলরাম চৌধুরির সময় ক্লাব ছেড়ে চলে যাই, রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এর পিছনে ক্ষমতায় না থাকা দেবাশিসদের বুদ্ধি আছে। এইবার ওরা ক্ষমতায় ফিরতেই যদি ফিরে আসতাম, তাহলে সেই রটনাটাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হত। চাইনি আমার জন্য ওরাও কোনও অস্বস্তিতে পড়ুক, আর আমিও বিতর্কের মধ্যে ঢুকতে চাইনি। এখন প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, আমার যে কোনও সিদ্ধান্তর পিছনে শুধু আমারই হাত থাকে। তাই এবার মোহনবাগানে ফিরতে আর কোনও অসুবিধা নেই।”
তাহলে সেদিন বলরাম চৌধুরির সময়ে মোহনবাগান ছাড়লেন কেন?
ব্যারেটো বলা শুরু করলেন, “গোয়া থেকে সবে কলকাতা ফিরেছি। বলরাম চৌধুরিরা জানিয়ে দিলেন, মার্কোসের চুক্তি বাতিল করে তাঁকে ছেড়ে দিতে চান। সেই সময় মার্কোসের স্ত্রী ৮ মাসের সন্তান সম্ভবা। সেই অবস্থার মধ্যে মার্কোসকে ক্লাব বলল, নীলাচলের ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। ৮ মাসের সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে বেতন ছাড়া সেই সময় কোথায় তাবে মার্কোস? প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু ওরা কিছুতেই শুনল না।” তারপর? “এদিকে আমার তিন মাসের বেতন বাকি রেখেছে ক্লাব। কিছুতেই দিচ্ছে না। রোজ ওদের বলছি বেতনের জন্য। ভিতরে ভিতরে এত কিছু হচ্ছে অথচ একটি বারের জন্যও আমি কিন্তু বাইরে কারও কাছে মুখ খুলিনি। অথচ একদিন সংবাদপত্রে পড়লাম, ক্লাব কর্তারা বলছেন, আর্থিক কোনও সমস্যাই নেই। আর থাকলেও আমাকে মিটিয়ে দিতে চায়। এরপর আমার সঙ্গে একদিন আলোচনাতেও বসলেন ক্লাব কর্তারা। তিন মাসের বাকি। অথচ দিতে চান মাত্র এক মাসের টাকা। অথচ বাইরে গিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে বলছে, সব কিছু মিটিয়ে দিতে চায়। একেক জায়গায় একেকরকম বিবৃতি। আমি দেখলাম, ৮ মাসের সন্তান সম্ভবা একজন মহিলাকে যদি ফ্ল্যাট থেকে বের করে দিতে পারে, তাহলে কোনওদিন আমার বাকি বেতনটাও আটকে দিয়ে নিজেদের প্লেয়ার নিয়ে আসতে পারে। সেই সময়ের কর্তাদের কিছুতেই আর বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। খেলব কী, এক অজানা আতঙ্ক তাড়া করত আমায়। ভীষণ অসহায় বোধ করতাম। সেই প্রথমবার মনে হতে লাগল, মোহনবাগান আমার ঘরের জায়গা নয়, বিদেশে আছি। তখনই ঠিক করি, বকেয়া বেতনের জন্য আমার প্রাণের থেকে প্রিয় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে কোথাও কোনও নালিশ করব না। বেতন চেয়ে ফিফায় টেনে নিয়ে যাব না ক্লাবকে। কিন্তু আমি আর এই পরিবেশে থাকব না। চলে যাব অন্য কোথাও।” সেই জন্যই কি সেই সময় কর্তারা যখন আপনি দল ছাড়লে ফিফায় যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, নিশ্চিন্ত বোধ করতেন?
–“একদম। কারণ, জানতাম, বেতন না দিয়ে দোষ ওঁরা করেছে। ফিফায় গেলে ক্লাব সমস্যায় পড়বে, আমি নই। তাই মালয়েশিয়ায় গিয়ে যখন পেনাংয়ে খেলা শুরু করে দিলাম, তখনও কিছুই করতে পারেনি।”
না। পরের মরশুমে আর কোনও সমস্যা হয়নি। মাহীন্দ্রা থেকে ফের নিজের ডেরায় ফিরে এলেন সবুজ তোতা। তারপর থেকে তিনি শুধু মোহনবাগানেরই। তবে রেগে গিয়েছিলেন আরও একদিন। মারাত্মক ভাবে।  গল্পটা পরে কখনও বলব।

1 comment:

Note: Only a member of this blog may post a comment.