বাইচুংকে এগিয়ে দিলেন লিয়েন্ডার –১২






   এখনও প্রচণ্ডভাবে বিশ্বাস করি, সেদিন ডান্স রিয়ালিটি শো ঝলক দিখ লা যা’–কে কেন্দ্র করে মোহনবাগান সচিব অঞ্জন মিত্রর সঙ্গে মতবিরোধ চরমে না উঠলে, ক্লাব ফুটবলে শেষ ম্যাচটা মোহনবাগান জার্সিতেই খেলতেন  বাইচুংশুরুতে জেসিটি যাওয়া ছাড়া শেষের দিকে যে দুবার ইস্টবেঙ্গল থেকে মোহনবাগানে যান, এবং মোহনবাগান থেকে ইস্টবেঙ্গলে আসেন, কোনওবারই ক্লাব ছাড়ার জন্য নিজের থেকে উৎসাহী ছিলেন নাবরং বারবার ক্লাব বদলানোতে ভীষণভাবে অবিশ্বাসী ছিলেন তিনিআর ঝলকের সমস্যা শুরু হওয়ার আগে মোহনবাগান কর্তাদের সঙ্গে সত্যিই ভাল সম্পর্ক ছিল তাঁর 
সেই সময় ইস্টবেঙ্গলমোহনবাগানের মধ্যে অলিখিত চুক্তি ছিল, কোনও দলই তাঁদের ফুটবলারকে নিতে পারবে নাফুটবলাররা যাতে এক ক্লাবকে দেখিয়ে আরেক ক্লাব থেকে চুক্তির অঙ্ক বাড়িয়ে নিতে না পারে, এটাই ছিল চুক্তির পিছনের আসল কাহিনীবাইচুং অবশ্য এসব চুক্তির বাইরে ছিলেনফলে এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে যেতে তাঁর কোনও অসুবিধা ছিল না 
দ্বিতীয়বারের জন্য ইস্টবেঙ্গল থেকে মোহনবাগানে গিয়েছেন। ব্যারেটোকে সঙ্গী করে দারুণ ফর্মেকিন্তু ইস্টবেঙ্গল কর্তারা চাইতেন বাইচুং ফিরে আসুক লালহলুদ জার্সিতেবিশেষ করে ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ফুটবল সচিব বাবু ভট্টাচার্যইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রাক্তন সচিব পল্টু দাসের পর বাবু ভট্টাচার্যেরই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন পাহাড়ি বিছে দমদমে তাঁর সান্নিধ্যেই বেড়ে ওঠা বাইচুংয়েরযে সম্পর্কটা রয়ে গিয়েছে এখনওসেই বাইচুং মোহনবাগানে খেলুক কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনিএকদিন দেবব্রত সরকারকে নিয়ে বাইচুংয়ের হাইল্যান্ড পার্কের ফ্ল্যাটে পৌঁছে গেলেন তিনিহাতে ম্যাকডাওয়েল কর্তৃপক্ষ এবং মোহনবাগান ক্লাবকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি 
সেই সময় বাইচুংয়ের সঙ্গে মোহনবাগানের চুক্তি ছিল দু’বছরেরআর সেটাই প্রথম বছরবাবু ভট্টাচার্য এবং দেবব্রত সরকার ফিরে আসার জন্য অনেক করে বোঝালেন পাহাড়ি বিছেকে। পাল্টা যুক্তি দিলেন বাইচুং, দুবছরের চুক্তিইস্টবেঙ্গলে খেলতে চাইলেই বা আসবেন কী করে? লালহলুদ কর্তারা বোঝালেন, বাইচুং চাইলে সব সম্ভবতারপরই চিঠিটা বাইচুংয়ের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, এখানে লেখা আছে, ‘আমি মোহনবাগান ছাড়াতে চাই।’ বাইচুংতো চিঠিটা হাতে পেয়ে ভাবে পাচ্ছেন না কী বলবেন। ইস্টবেঙ্গল কর্তারা বোঝালেন, চিঠিটা সই করে মোহনবাগান কর্তাদের হাতে দিয়ে দিতেবাকিটা ইউবি গ্রুপের সঙ্গে তাঁরা কথা বলে নেবেন। 
পরের দিন চিঠিটা নিয়ে মোহনবাগান কর্তা দেবাশিস দত্তর অফিসে পৌঁছে গেলেন বাইচুং। চিঠিটা পড়ে তাঁর সামনেই ছিঁড়ে ফেললেন দেবাশিস দত্ত। বললেন, “তুই কি পাগল হয়েছিস? যতদিন খেলবি, মোহনবাগানেই খেলবি। ” তখন কি আর দু’পক্ষই জানত, উভয় পক্ষের মধ্যে এভাবে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, ‘ঝলক দিখ লা যা।’
সেদিন বিকেলে প্র‌্যাকটিস ছিল নিজেদের মাঠে। মোহনবাগান তাঁবুতে ঢোকার মুখে ডান দিকে যে জায়গায় মালিরা ফুটবলারদের জার্সি–প্যান্ট পরিস্কার করে, ঠিক সেখানেই প্র‌্যাকটিস শেষে বসেছিলেন বাইচুং। দূর থেকে অনেকক্ষন ধরে দেখছি, মোবাইলে কাউকে কিছু একটা বোঝাচ্ছেন। ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে মিশতে বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা সিরিয়াস ব্যাপার। একজন রিপোর্টারের এই বোঝার ব্যাপারটা কী ভাবে হয়, তার সত্যিই কোনও ব্যাখ্যা নেই। অনেকটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়র প্রয়োগ বলতে পারেন।  যাই হোক ক্লাব থেকে বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে বসে থাকলাম। মন বলছিল, কিছু একটা হয়েছে। নাহলে জার্সি–প্যান্ট পড়েই ক্লাবের সিড়িতে বসে অতক্ষন কারও সঙ্গে মোবাইলে কথা বলবেন না বাইচুং। 
স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই গাড়িতে বসে চুপ। এবার আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু হয়েছে?’ উত্তর এল না কিছুক্ষন। তারপর বললেন, “কী করা উচিত বুঝতে পারছি না।”
–কেন?
–“লিয়েন্ডার ফোন করেছিল। দারুণ একটা অফার। বাট ডিসিশন নিতে পারছি না।’’
সেই সময় লিয়েন্ডারের এনডোর্সমেন্ট দেখতেন মুম্বইয়ের রাজীব বলে এক ব্যক্তি। রাজীব সেই সময় বাইচুংয়ের এনডোর্সমেন্টও দেখছেন। এটা সম্ভব হয়েছিল, লিয়েন্ডার আর বাইচুং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বলে। লিয়েন্ডারের মাধ্যমেই রাজীবের সঙ্গে আলাপ বাইচুংয়ের। সেই রাজীব লিয়েন্ডারকে প্রস্তাব দিলেন, ডান্স রিয়ালিটি শো ‘ঝলক দিখ লা যা’ সেবারই প্রথম শুরু হচ্ছে। একজন ক্রীড়াবিদ চাইছ। লিয়েন্ডার যদি যোগ দেন, ভাল অ্যাপিয়ারেন্স ফি। মানে প্রথম রাউন্ডে হেরে গেলেও অ্যাপিয়ারেন্স ফি থেকে যা পাওয়া যাবে, তা প্রচুর অর্থ। কিন্তু লিয়েন্ডারের সেসময় বিদেশের কোনও টুর্নামেন্টে আগের থেকেই নাম রেজিষ্ট্রশন হয়ে গিয়েছিল। লিয়েন্ডার তখন রাজীবকে পরামর্শ দিলেন বাইচুংকে বলার জন্য। ঝলকের প্রোডিউসাররা বাইচুংয়ের নামে তখনই রাজি। তারপরেই লিয়েন্ডারের সেই দীর্ঘ ফোন। 
এদিকে, আই লিগ চলছে। তাই বাইচুংয়ের হাতে সময় কম। কিন্তু ভীষণভাবে চাইছিলেন মুম্বইয়ের ডান্স রিয়ালিটি শোতে অংশ নিতে। 
পরের দিন ক্লাব গিয়ে কোচ করিম সহ দেবাশিস দত্ত, সৃঞ্জয় বোস এবং প্রাক্তন সচিব অঞ্জন মিত্রকে খুলে বললেন ব্যপারটা। জানালেন, ম্যাচ মিস করবেন না। ম্যাচের আগের দিন প্র‌্যাকটিসও মিস করবেন না। তাছাড়া একদিনের তো ব্যাপার। সেখানে যেহেতু সব পেশাদার ডান্সাররা আসবেন, তাই প্রথম দিনের পর নিশ্চিত ভাবেই হেরে যাবেন। তবে প্র‌্যাকটিস কামাই করে যাওয়টার জন্য তাঁর রিয়ালিটি শো’র প্রাপ্য টাকা থেকে তিনি ক্লাবকে জরিমানা দিতে রাজি আছেন। 
তখন বাইচুংয়ের সঙ্গে অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক মোহনবাগানের। তাই জরিমানার কথা উঠলে সঙ্গে সঙ্গে তা নস্যাৎ করে দিলেন কর্তারা। কিন্তু সমস্যা তৈরি হল অন্য জায়গায়। একটা করে রাউন্ড যায়, আর জিততে শুরু করে দিলেন বাইচুং। তাতেও ম্যাচ এবং তার আগের দিনের প্র‌্যাকটিস কামাই করেননি। সমস্যাটা বাঁধল, আই লিগে রানার্স হতে। তারপরেও অবশ্য সুপার কাপে চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু অঞ্জন মিত্র মনে করলেন, বাইচুং রিয়ালাটি শোতে মন না দিলে নিশ্চিক ভাবেই সেবারও জাতীয় লিগটা মোহনবাগানের ঘরেই আসত। তবে সে অন্য গল্প। সে গল্পে অন্য কোনও দিন আসা যাবে। আজ শুধুই ঝলকের গল্প। 
শুটিং হবে গোরেগাঁও ফিল্ম সিটিতে। ভোর ৬ টায় কল টাইম। ভোরবেলা বাইচুং আর মাধুরির সঙ্গে আমিও মুম্বইয়ের সাহারা হোটেল থেকে রওনা দিলাম রিয়ালিটি শো’র সেটে। পৌঁছে দেখলাম, বিশাল আয়োজন। সেটের মধ্যে লোক গিজ গিজ করছে। মানে সবাই শুটিংয়ের সঙ্গে জড়িত। টলিউডে যাঁরা রিয়ালিটি শোয়ের শুটিং দেখে অভ্যস্ত, তাঁরা ধারমাই করতে পারবেন না, মুম্বইয়ের রিয়ালাটি শোয়ের কী পরিমাণ আয়োজন। মেকআপ ভ্যান নয়, স্টুডিওতে একটা প্রাইভেট রুম দেওয়া হয়েছিল বাইচুংকে। ঠিক হল, ঠিক ছিল, সেদিন শাহিদ কাপুরের একটি গানের সঙ্গে ডান্স করবেন তিনি। তাই ঝাঁকরা চুলের একটা উইগ এল বাইচুংয়ের জন্য। যাতে ডান্স করার সময় শাহিদ কাপুরের মত লাগে। উইগটা পড়ে দেখলেন, কিম্ভুত কিমাকার লাগছে। ফলে অনুরোধ করলেন, উইগটা বাদ দিয়ে দিতে। যাই হোক চোখ ধাঁধানো সেটে শুরু হয়ে গেল শুটিং। দর্শক আসনে আমি আর মাধুরি পাশাপাশি বসে। আর এসেছিল অভিষেক যাদব। বিচারকের ভূমিকায় জুহি চাওলা, সদ্য জীবনাবসান হওয়া সরোজ খান এবং বৈভবি মার্চেন্ট। বাইচুংয়ে স্টেজে উঠতেই জুহি বললেন, “কাল দেশের হয়ে খেলে আজ সরাসরি ডান্স করতে চলে এসেছেন বাইচুং।” জুহির ফুটবল জ্ঞান দেখে আমি আর মাধুরি তখন মুখ টিপে হাসছি। আগের দিন আই লিগে মোহনবাগানের হয়ে খেলেছেন তিনি। যাই হোক ডান্স শেষে প্রচুর প্রশংসা আর হাততালি কুড়োলেন। 
বাইচুংয়ের পরের প্রতিযোগি ছিলেন ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ খ্যাত ভাগ্যশ্রী। 
শুটিং শেষে ভাগ্যশ্রী একটি ছেলেকে নিয়ে এলে বাইচুংয়ের রুমে। বাইচুং আলাপ করিয়ে দিতে আমরা অবাক। এই সেই ভাগ্যশ্রী! এখনও দেখেই মনে হচ্ছে না কতদিন আগে নায়িকা ছিলেন তিনি। চাইলে এখনও নায়িকার রোলে দিব্যি অভিনয় করতে পারেন। তবে বিষ্ময়ের আরও বাকি ছিল, যখন ভাগ্যশ্রী বলেলন, সঙ্গের বড় ছেলেটি তাঁর নিজের ছেলে। এতক্ষন আমরা ভাবছিলাম, খুব বেশি হলে দিদি আর ভাই। যাইহোক ভাগ্যশ্রী বাইচুংকে বললেন, “আমার ছেলে তোমার খুব বড় ফ্যান। তোমার সঙ্গে ছবি তুলতে চায়।” অটোগ্রাফ দেওয়া, ছবি তোলা সব হল। এরপর ভাগ্যশ্রী অনুরোধ করলেন, সেদিনকার ডিনারটা তাঁর সঙ্গে করতে। রাজি না হয়ে উপায় ছিল না। শুটিং প্যাকআপের পর আমরা  সবাই মিলে ডিনারে গেলাম। 
সেই বছরে বাইচুংয়ের সঙ্গে যেখানে ট্রাভেল করেছি, এয়ারপোর্ট বা ফ্লাইটের মধ্যেও বাইচুংয়কে দেখলেই, “লাস্ট উইকে আপনার ডান্সটা দারুণ হয়েছে। আমরা কিন্তু চাইছি আপনিই চ্যাম্পিয়ন হোন।’’ প্লিজ, প্লিজ একটা ছবি তুলেত পারি? আমার স্ত্রী বলছিল, আপনি না কি দারুণ ডান্স করেন?” এরকম শুনতেই হত। বাইচুং বলত, “দ্যাখ কী অবস্থা। নেহরু কাপ জিতে পরের দিন ফ্লাই করার সময়েও বোধহয় এত লোক ছবি তুলতে চাইত না। কিন্তু যেই বলিউডে রিয়ালিটি শোতে নেমেছি, একদম ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছি।” 
কী আর করা যাবে, দেশটার নাম তো ভারতবর্ষ। যেখানে হয় তুমি বলিউডের ফ্যান, নাহলে ক্রিকেটের!

    

































































































































































































































































1 comment:

Note: Only a member of this blog may post a comment.